Breaking News
Home >> Breaking News >> তিন ছেলে দেখে না, পঞ্চান্ন বছর বয়সে নৌকা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন গৃহবধূ

তিন ছেলে দেখে না, পঞ্চান্ন বছর বয়সে নৌকা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন গৃহবধূ

কল্যাণ অধিকারী, স্টিং নিউজ, হাওড়াঃ তিন ছেলের ঘরে ঠাই হয়নি। স্বামী অসুস্থ। টানাটানির সংসার চালাতে নৌকার হাল ধরতে হয়েছে। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীতে সপ্তাহের সাতদিন নৌকা পারাপার করে কোনক্রমে জীবন-জীবিকা এগিয়ে নিয়ে চলেছেন গ্রামীণ হাওড়ার ঝামটিয়া অঞ্চলের খড়িগেড়িয়ার বছর পঞ্চান্নর গৃহবধূ অন্ন দলুই।

পরনে কালচে লাল রঙের ছাপা শাড়ি। লম্বা হাতা লাল ব্লাউজ। দু হাতে শাখা-পলা। কপালে লাল টিপ। গায়ের রঙ শ্যামা। তেরো হাত লম্বা ও চার হাত চওড়া নৌকায় হাল বেয়ে এপার-ওপার করছেন। যাত্রী বলতে দু-তিনটে গ্রামের মানুষজন সঙ্গে থাকা সাইকেল। ভোর ৬টা থেকে শুরু হয় হাল টানা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে নৌকা পাড়ে বেঁধে বাড়ির পথ ধরে। ল্যাম্পের আলোয় গুণতে গিয়ে দেখেন কোনদিন পঞ্চাশ টাকা কোনদিন আবার তাও হয় না। পরিচিতরা পাড়ের কড়ি না দিয়ে হাসি মুখে নেমে যায়। মহিলা মাঝি সবকিছু মুখ বুজে মেনে নেয়। যেমনটা মেনে নিয়েছে এলাকার মনসা পুজোয় বছরে দু-তিন হাজার টাকা চাঁদা দেওয়া।

জয়পুর থানার খড়িগেড়িয়া গ্রামের অন্ন দলুই কে একডাকে সবাই চেনে। এক দশক ধরে থলিয়া-বাকসি ক্যানেলে নৌকা বেয়ে চলেছেন। ঘরে তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। তাদের প্রত্যেকের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ছেলেদের সংসারে বাবা-মায়ের স্থান হয়নি। হাল টেনে সংসার চালায় অন্ন। সারাদিন হাল টানতে গিয়ে দু হাত ও কাঁধ ব্যাথা হয়ে যায়। নিয়ম করে রাতে ওষুধ খেতে হয়। সব সহ্য করেই রাতে দু চোখের পাতা এক হয়ে যায়। সব্জি নিয়ে আসলে একটু বেশি যেমন দেয়। তাকে নৌকায় তোলা ও নামানো সাহায্য করতে হয়। বর্ষায় জল বাড়লে অসুবিধা হয়। ঢেউয়ের টানে নৌকা টেনে নিয়ে যায়। শক্ত হাতে হাল ধরে ঠিক পাড়ে নিয়ে আসে। বিপজ্জনক জেনেও মাঝি অন্ন’র হাতজশ লোকের মুখেমুখে। ভরা বন্যার সময়েও নিজ দক্ষতায় নৌকা চালিয়ে যায়। খড়িগেড়িয়া, খালনা সহ একাধিক গ্রামের মানুষের কাছে অন্ন সাক্ষাৎ ‘অন্নদামঙ্গল’।

যদিও নিজের কাজকেই সম্মান জানায় নৌকার মাঝি অন্ন দলুই। ওঁনার কথায়, “দশ-পনেরো বছর নৌকা চালাচ্ছি। বিপদ কে চোখের সামনে দেখেও ভয় পাইনি। ভরা বন্যায় চোখের সামনে দিয়ে বিষধর সাপ ভেসে গেছে। গতবছর বর্ষার সময় ঢেউয়ে একজন পড়ে গিয়েছিল তাকেও উদ্ধার করে নৌকায় তুলি। জ্বর-জ্বালা সব সঙ্গে করে নৌকা চালিয়েছি। রাতে খুব কষ্ট হয়।

কোন-কোনদিন যন্ত্রণায় সারারাত জেগে থাকি। আগে স্বামী নৌকা চালাতেন। ওঁ অসুস্থ হতে আমি চালাতে শুরু করি। খড়, গরু, মানুষ, সাইকেল সব পার করি। মেয়েদের ঘরে অনুষ্ঠান হলে যা হোক কিছু দিই। ছোট মেয়ের সংসারে টাকার জন্য অশান্তি হচ্ছে। মেয়েটা আমাকে বলে। কোথা থেকে দেব বলো। ওকে বলি মুখ বুজে সহ্য কর। সারা বছর নৌকা চালাই বলে গ্রামের মনসা পুজোয় দু-তিন হাজার টাকা চাঁদা চায় দিতে হয়। স্বামীর বয়স সাতষট্টি। স্বামী মাসখানেক আগে পা ভেঙে ঘরে বসে। প্ল্যাস্টার করতে দু হাজার টাকার মত খরচ। সরকারি সাহায্য কোনকিছু মিললে অনেকটা সুবিধা হয়।”

আমতা ২ নং ব্লক সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক দেবদাস নস্কর জানান, আপনার কাছে থেকে বিষয়টি প্রথম জানলাম। আমি নিজে ওঁনার সঙ্গে যোগাযোগ করব। কিভাবে সহযোগিতা করা যায় দেখছি।

খড়িগেড়িয়া গ্রামটি ঝামটিয়া অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। এলাকাবাসী লালকমল দলুইয়ের কথায়, “আমরা বহু বছর ধরে দেখছি নৌকা চালাতে। বন্যার সময় ওঁনার নৌকায় পার করে কলেজে পরীক্ষা দিয়ে এসেছে। দেখলে কষ্ট হয়। ছেলে-মেয়ে সংসার থেকেও সবাই ভিন্ন। হাল টেনে খেতে হচ্ছে। মনসাতলা-তেখালা কাঠের পোল এলাকায় নৌকা চালান।” দু’দিন আগে নদীর পাড়ে মনসা পুজো হয়েছে। মাইক-বক্স খোলা হয়েছে। সারা বছর নৌকা চালায় আর রাতে মা মনসাকে কষ্টের কথা জানিয়ে ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এ বার জানিয়েছেন স্বামীর পায়ের প্ল্যাস্টার যাতে করাতে পারে। তিন ছেলে বাবা-মাকে না দেখলেও মা মনসা সহায় রয়েছে। ভরা বর্ষায় নদীর জলে স্রোত থাকলেও অন্ন’র নৌকা ঠিকঠাক পার করে দেয়।

এছাড়াও চেক করুন

কালীগঞ্জে আলিয়া মাদ্রাসা ভোটে জয়ী তৃণমূল

স্টিং নিউজ সার্ভিস, নদিয়াঃ কালীগঞ্জের জানকিনগর আলিয়া মাদ্রাসার নির্বাচনে নির্বাচনে রবিবার ব্যাপক ভোটে জয়লাভ করে …

Leave a Reply

Your email address will not be published.