Breaking News
Home >> Breaking News >> উপপ্রধানের পুকুরের মাছ খেয়ে নিচ্ছে রাজ্য প্রাণী বাঘরোল, ধরতে লোহার খাঁচা পাতলো বনদপ্তর

উপপ্রধানের পুকুরের মাছ খেয়ে নিচ্ছে রাজ্য প্রাণী বাঘরোল, ধরতে লোহার খাঁচা পাতলো বনদপ্তর

কল্যাণ অধিকারী, স্টিং নিউজ, হাওড়া: অপরাধটা বেশ জোড়ালো। রাতের অন্ধকারে জলাশয়ে নেমে প্রায়শই মাছ খেয়ে নিচ্ছে। তাও যার তার নয় খোদ গ্রাম পঞ্চায়েত উপপ্রধানের। চিন্তায় রাতের ঘুম উড়েছিল। তারপর দ্বারস্থ হন প্রশাসনের। জানানো হয় বাড়ির বাচ্চাদের দিকে কামড়াতে তেড়ে আসছে। বিডিও মারফৎ খবর যায় বনদপ্তরে। পাতা হয় খাঁচা। দু’দিন পর ধরা পড়ল একটি বাঘরোল। শুক্রবার সকালে গ্রামীণ হাওড়া আমতা-২নং ব্লকের ঝিখিরা বাড়োবাউন গ্রামে বাঘরোলটিকে ধরা হয়। খাঁচায় বন্দী বাঘরোল কে সেলফি তুলে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করলেন উপপ্রধান। যা দেখে প্রশ্ন তোলে পশুপ্রেমিক সংগঠন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সপ্তাহখানেক ধরে বাঘের মতো দেখতে কোন পশু এলাকায় ঘোরা ফেরা করছে। ঝিখিরা গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান মহাদেব সাঁতরার পুকুরে মাছও খেয়ে নিচ্ছে। চিন্তায় পড়ে যান উপপ্রধান। তাঁর মাছচাষের ব্যবসায় ক্ষতি হচ্ছে। আমতা-২নং জয়েন্ট বিডিও তে যোগাযোগ করেন। বিডিও মারফৎ খবর যায় উলুবেড়িয়া বনদপ্তরে। শুরু হয় অনুসন্ধানের কাজ। বন দপ্তরের অভিজ্ঞ আধিকারিক উৎপল বাবুর বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে ওটা বাঘের মতো দেখতে হলেও আসলে বাঘরোল। যা জলাশয়ের ধারে, হোগলা ও খড়ি বনে ঘোরাফেরা করে। খুব শান্ত প্রকৃতির প্রাণী। কাউকে আক্রমণ তো দূর মেঠো ইঁদুর, পোকা খেয়ে জীবন বাঁচিয়ে রাখে। শুরু হয় এলাকায় গিয়ে খোঁজখবর নেওয়া।

উলুবেড়িয়া রেঞ্জের ভারপাপ্ত বন আধিকারিক উৎপল সরকার জানান, আমাদের কাছে অভিযোগ আসে যে, ঝিখিরা গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান জয়েন্ট বিডিও কে জানিয়েছেন ওঁর এলাকায় একটি পশু ঘোরাফেরা করছে। বাচ্চাদের কামড়ে দিতে যাচ্ছে ! দেখতে অনেকটা বাঘের মতো। এলাকায় খুব বিরক্ত করছে। সেইমতো আমরা যাই এলাকায়। শুরু করি অনুসন্ধান। বুঝতে অসুবিধা হয়নি ওটা আদপে বাঘরোল। ও কামড়ায় না তেড়েও যায় না। উলটে মানুষ দেখলে ভয়ে লুকিয়ে পড়ে। মেঠো ইঁদুর, পোকা খেয়ে থাকে। তবুও কে শোনে কার কথা। দুদিন আগে পাতা হয় খাঁচা। শুক্রবার সকালে ধরা পড়ে একটি বাঘরোল। এলাকাবাসীকে বোঝানো হয় যে এরা খুব শান্ত। হতে পারে পুকুরে নেমে মাছ খেয়ে থাকতে পারে। কিন্তু কাউকে তেড়ে যায় না। উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয় উলুবেড়িয়ায়। তারপর গড়চুমুক পশুচিকিৎসা কেন্দ্রে ঐ বাঘরোলটিকে পাঠানো হয়েছে। লোহার খাঁচায় আটকে থাকায় পায়ে কোন চোট লেগেছে কিনা দেখা হবে। সেইমত ক’দিন পর ছেড়ে দেওয়া হবে।

উচ্চতায় বিড়ালের থেকে কিছুটা বড়। গায়ে ছোপ ছোপ দাগ। ওজন পাঁচ কেজির মতো। কয়েক দশক আগে বাংলার রাজ্য প্রাণী’র আখ্যা জোটে। নাম বাঘরোল। ক্রমশ কমে আসছে এদের সংখ্যা। রক্ষায় এগিয়ে এসেছে বহু পশুপ্রেমী সংগঠন। কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে জুড়ে থাকা প্রাণীদের এভাবে কি লোহার খাঁচায় বন্দি করা যায় প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। সমাজে বিরক্ত করা ও প্রাণঘাতী হলে তবেই সেই প্রশুদের লোহার খাঁচা পেতে ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাবে রাজ্য-প্রাণী বাঘরোল কে খাঁচায় বন্দী করা হল। যেটা একপ্রকার আইন বিরুদ্ধ বলেও অনেকে মন্তব্য করেন।

বাঘরোল নিয়ে গবেষণা ও সংরক্ষণ মূলক কাজের সঙ্গে জড়িত আন্তর্জাতিক সংস্থা স্মল ওয়াল্ড ক্যাট কনসারভেশন প্রোজেক্ট-এর সদস্য এবং সদ্য রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার প্রাপ্ত তিয়াসা আঢ্য জানান, আমি অবাক হচ্ছি এটা ভেবে, বাঘরোল কখনও কাউকে কামড়েছে বলে শুনিনি। তারপরও কেন লোহার খাঁচা ? হতে পারে মাছ খাচ্ছে কিন্তু সেই সংঘর্ষ মেটাবার দায় বাঘরোলের নয়। রাজ্য প্রাণী সংরক্ষণের দায়িত্ব সবার। একা বন দপ্তরেরও নয়। ব্লক অফিসে অনেক স্কিম থাকে। সহজে সেসব স্কিম ব্যবহার মানুষের সাথে বাঘরোলের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। একটা আলফা মেল বাঘরোল কে এলাকা থেকে তুলে নিয়ে গেলে সেই জায়গায় অন্য বাঘরোল এসে যাবে। তাহলে কতগুলো বাঘরোল কে এভাবে বন্দী হতে হবে ?

এ বিষয় বন আধিকারিক উৎপল বাবু জানান, আমরা এলাকায় আবারও গিয়ে প্রচার চালাব। যাতে করে বোঝান যায় রাজ্য প্রাণী বাঘরোল খুবই শান্ত প্রাণী। এরা কোনভাবে কাউকে আক্রমণ করে না। আগামীদিনে কোনভাবেই বাঘরোল ধরতে খাঁচা পাতা হবে না। বাঘরোল বাঁচাতে নতুন কি কি পদক্ষেপ কেওয়া হচ্ছে এ বিষয় তিয়াসা বলেন, মাছ চাষিদের সঙ্গে বাঘরোল সংরক্ষণ এর জন্য তাজপুর বাঘরোল সংরক্ষণ সমিতি ও সারদা প্রসাদ জনকল্যাণ সমিতি একটা অভিনব প্রদক্ষেপ নিয়েছে। আমতা ২ নং ব্লকের ৪০জন মাছচাষীদের ১৫০০টাকার ১০কেজি মাছের চারা দেওয়া হবে। বলা হবে পরের বছর ১৫০০টাকা ফেরত দেবেন যাতে আবার ওই টাকার মাছের চারা দেওয়া যায়। এইভাবে প্রকল্পটি চলবে বাঘরোল সংরক্ষণের জন্য। ওই সংস্থাটির পাশে যদি সরকারি সংস্থা যেমন পঞ্চায়েত সমিতি বা ব্লক ডেভলপমেন্ট অফিস তাহলে মনে হয় কিছুটা সুরাহা হবে। কারণ এভাবে বাঘরোল কে তার বাসস্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া কার্যকারী নয়। খালি জায়গায় আবারও অন্য বাঘরোল চলে আসবে। কত বাঘরোল কে বনদপ্তর উদ্ধার করবে।

ঝিখিরা গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান মহাদেব সাঁতরা সোশ্যাল মিডিয়ায় দুটি পোস্ট করেন। যারমধ্যে একটি তে খাঁচায় বন্দী বাঘরোলের সঙ্গে নিজের সেলফি। রাজ্যপ্রাণী কে খাঁচায় বন্দী অবস্থায় সেলফি তোলা যায় ? এবং কিভাবে বাঘরোল ধরবার জন্য বনদপ্তরে যোগাযোগ রাখলেন এ বিষয় নিয়ে আমতা ২নং ব্লকের জয়েন্ট বিডিও সুব্রত সরকার কে প্রশ্ন করা হলে উনি জানান, খাঁচায় বন্দী বাঘরোলের সঙ্গে সেলফি তুলে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা যায় না। আমি এখুনি ওনাকে ওই পোস্ট মুছে দেবার কথা বলছি। ঊনি বলেছিলেন বাঘরোলটি মাছ খেয়ে নিচ্ছে। তারপর আমরা যোগাযোগ করি বনদপ্তরে। ওঁনারা বলেন বিষয়টি দেখে ব্যবস্থা নিচ্ছি। বাঘরোল নিয়ে আমি নিজে প্রচার চালাব। লোহার খাঁচায় বন্দী করা হবে না।

এ বিষয় ঝিখিরা গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান মহাদেব সাঁতরা কে ফোনে পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপ-এর জবাব দেননি। বাঘরোল পুকুরে মাছ খেয়ে নিচ্ছে তাকে ধরতে লোহার খাঁচা বসাবার সিদ্ধান্ত এবং খাঁচা বন্দী বাঘরোল কে নিয়ে সেলফি বেজায় চটেছে পশুপ্রেমী সংগঠন। আগামী ২৩তারিখ ওই এলাকায় সচেতনতামূলক প্রচারে আসছে একটি সংগঠন। দেওয়া হবে লিফলেট।

এছাড়াও চেক করুন

হিংস্র প্রাণী না থাকায় সার্কাসে দর্শক বিমুখ, গ্রামীণ মেলায় উপচে পড়ছে ভিড়

কল্যাণ অধিকারী, স্টিং নিউজ, হাওড়াঃ ডিসেম্বর মাস আসলেই গ্রাম বাংলায় সার্কাসের তাঁবু বসতো। বাঘ-সিংহ, বিদেশি …

Leave a Reply

Your email address will not be published.